Wednesday, December 29, 2010

নকশিকাথার গল্প

বিশাল জমিনজুড়ে শুধু নকশার কারসাজি। হাতি, ঘোড়া কত কী! মনে হয়, কাঁথা তো নয়, যেন কোনো শিল্পীর ক্যানভাস। হাতের সামান্য স্পর্শে, সুঁই-সুতোর একেকটা ফোঁড়ে এত সুন্দর নকশা হয়, না দেখলে বিশ্বাস হবে না কারও। তাই গুলশান এভিনিউর রাস্তা দিয়ে হাঁটতে গিয়ে প্রায়ই থমকে দাঁড়াতে হয় পথচারীদের। একপাক দেখে নিতে হয় নকশিকাঁথার অপূর্ব সুন্দর শৈলী।
আজাদ মসজিদের সামনে আর আশপাশের রাস্তার দুই পাশে লম্বা দড়িতে টাঙানো আছে সারি সারি নকশিকাঁথা। হেঁটে যাওয়া পথচারীরা তাই হঠাৎ দাঁড়িয়ে যান নকশিকাঁথা দেখতে। কেউ কেউ দরদামও করেন। দামে বনলে একটা কাঁথা নিয়ে চলে যান বাসার জন্য।

কূটনৈতিক পাড়া কিংবা একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ওয়েস্টিন হোটেলে অতিথি হওয়া বিদেশি নাগরিকেরাও এ পথ দিয়ে যেতে যেতে থেমে পড়েন। নকশিকাঁথার নান্দনিকতা তাঁদেরও মুগ্ধ করে। হাতে নিয়ে দেখে নেন ঘর-গেরস্থালি সামলানো সাধারণ নারীদের সৃজনশীলতার অসাধারণ এক নমুনা। সেই মুগ্ধতা কখনো কখনো এমন জায়গায় গিয়ে ঠেকে যে একটার জায়গায় দু-তিনটাও কিনে ফেলেন কেউ কেউ।
ফুটপাতের কাঁথা বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাণিজ্যিকভাবে নকশিকাঁথা তৈরি হয় যশোর আর চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলাকায়। আর বিছানার চাদর কিংবা কুশন কভার আসে জামালপুরের সরিষাবাড়ী থেকে।

আজাদ মসজিদের ঠিক সামনের রাস্তায় বসেন মোহাম্মদ ওসমান। তাঁর বাড়ি মাদারীপুরে। যশোর থেকে কাঁথা নিয়ে আসেন তিনি। বলছিলেন, ‘মহিলারা কয়েকজন মিল্যা কাঁথায় নকশা করে। কাঁথার নকশা কখনো আমরা বইল্যা দেই। কখনো এরা নিজের মতন কইরা বাইর করে। সেলাইয়ের কাজের ওপরে দাম ঠিক হয়।’
মানে নকশার সেলাই যত জটিল আর শ্রমসাধ্য হবে, এর দাম তত বাড়বে। সেভাবে চিন্তা করলে অবশ্য কোনো কাঁথারই দাম কম হওয়ার কথা নয়। কেননা, প্রতিটা কাঁথার জমিনেই যথেষ্ট জটিল নকশা করা। বলাই বাহুল্য, তা অত্যন্ত শ্রমসাধ্য। তার পরও ক্রস স্টিচ কাঁথার দামটা তুলনামূলকভাবে বেশি। ক্রস স্টিচের নকশিকাঁথার দাম পড়ে প্রায় আড়াই হাজার টাকা। আর আড়ং স্টিচ কিংবা সুজলা নকশিকাঁথার দাম এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা। আড়ং স্টিচের নকশিকাঁথার চাহিদাই সবচেয়ে বেশি।
দামটা একটু চড়া হলো কি না, সেই প্রশ্ন করলে সামান্য মনঃক্ষুণ্ন হলেন মোহাম্মদ ওসমান। বললেন, ‘এই কাঁথা সিলান অনেক কষ্ট, আনতেও অনেক ঝামেলা। ঐখানে গিয়া পইড়া থাকতে হয়। সব মিলাইয়া আমাদের লাভ থাকে অল্প।’
রাস্তার অপর পাশে কাঁথা নিয়ে বসেছিলেন মোহাম্মদ মোকসেদ। তিনিও সায় দিলেন এ কথায়, ‘আমরা দিনে তিন-চারটা কাঁথা বিক্রি করলে ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা লাভ হয়।’
ভিনদেশি খদ্দেরদের কাছে এ কাঁথার চাহিদা কেমন, সে কথা জানতে চাইলে নকশিকাঁথার আরেক ব্যবসায়ী আবু কালাম বললেন, ‘বিদেশিরা খুব আগ্রহ কইরা আমাদের কাঁথা নিয়া যায়। তয় তারা আগের থন চালাক হইয়া গেছে। দাম বেশি দিতে চায় না। বাঙালি সাথে কইরা নিয়া আসে দরদাম করার জন্য। তয় একবার নিয়া গেলে বারবার আসে।’

No comments:

Post a Comment