Wednesday, December 29, 2010

বছর শেষের রাতে

গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে ৩১ ডিসেম্বর। ঘড়ির কাঁটা রাত ১২টা ছুঁই ছুঁই। জমে উঠেছে আলোর রোশনাই। আঁতশবজির ফোয়ারা পাখা মেলবে শূন্যে। শেষ মুহূর্তের ক্ষণগণনা শুরু হয়েছে নিউইয়র্ক, প্যারিস, লন্ডন, সিডনিসহ বিশ্বের বড় শহরগুলোতে। পুরোনো বছরকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে বিশ্বজুড়েই পালিত হয় ‘থার্টি ফার্স্ট নাইট’। সারা বিশ্বের নগরবাসী মেতে ওঠে আমোদে। নিজ দেশের সংস্কৃতি অনুযায়ী চলে উদযাপন। নানা মুনির নানা মতের মধ্যে ঢাকাবাসী কি আদৌ পারছে থার্টি ফার্স্ট নাইট উদযাপন করতে?

‘আরে ঢাকাবাসী তো নিউ ইয়ার উদযাপন করতেই জানে না। এরা তো থার্টি ফার্স্ট নাইট উদযাপনের নামে যা করে, সেটা বিশৃঙ্খলা ছাড়া কিছুই নয়।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যানটিনে বসে বলছিলেন সংগীত বিভাগের শিক্ষার্থী সুদেষ্ণা চক্রবর্তী। ‘ঢাকা শহরে কোন জায়গা আছে, যেখানে থার্টি ফার্স্ব নাইট উদযাপন করা যায়, এক টিএসসি এলাকা ছাড়া? এইখানেও তো সবাই আসতে পারে না। তাহলে শহরের মানুষ যাবেই বা কোথায়?’ সুদেষ্ণার কথার পিঠে যোগ করলেন পাশের চেয়ারে থাকা তাঁরই বিভাগের বন্ধু আমান। তবে এঁদের দুজনের সঙ্গেই দ্বিমত পোষণ করলেন বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী আলমগীর কবির। তাঁর মতে, ‘আমাদের সংস্কৃতিতে যেটা নেই, সেটা কেন আমরা উদযাপন করতে যাব।’ তাঁর এ প্রশ্নের মুখর জবাব দিলেন তাঁরই এক বন্ধু আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের তাফসীর বাবু। ‘অনেক কিছুই তো আমাদের সংস্কৃতিতে নেই। কিন্তু সেগুলো কি আমরা করছি না। আর সংস্কৃতি সদা বহমান। সদা পরিবর্তনশীল।’ মধুর ক্যানটিনের কথার তুড়ি শেষ হলো এই সমাধান দিয়ে, ‘থার্টি ফার্স্ট নাইট উদযাপনে বাধা নেই। কিন্তু সেটা আমাদের মতো করে উদযাপন করতে হবে। আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের রীতি, আমাদের প্রথা অনুযায়ী।’

তরুণদের তপ্ত কথার অম্লমধুর বাক্যে যখন নগরের পরিবেশও গরম, ঠিক তখনই ঢাকার বাসিন্দারাও জানালেন তাঁদের দুঃখের কথা। নগরের উত্তরা, গুলশান ও ধানমন্ডি এলাকার বেশ কজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ইংরেজি নববর্ষ উদযাপন নিয়ে তাঁদের ক্ষোভের শেষ নেই। রাত হলেই ঘরে বসে থাকো। রাস্তায় বের হলেই দায়িত্বশীল র‌্যাব-পুলিশের নিরাপত্তার কড়াকড়ি। কেবল অভিজাত ক্লাব আর পাঁচতারকা হোটেলগুলোতে চলে আনন্দের সুবাতাস। সেটা আবার মেলে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে। এসব মিলিয়ে নগরবাসী আসলে নির্মল আনন্দে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের এই সন্ধিক্ষণটি পালন করতে পারছে না।
এ তো গেল একপক্ষের কথা। কিন্তু ওদিকে ছেলেমেয়েদের অভিভাবক এবং নগর কর্তৃপক্ষ কিন্তু দোষ দিচ্ছেন বাউণ্ডুলে ছেলেমেয়েদেরই। পল্টন এলাকার বাসিন্দা শিখা ইসলাম বলছিলেন, ‘নববর্ষ উদযাপন মানে তো আর বিশৃঙ্খলা সৃৃষ্টি করা নয়। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের ছেলেমেয়েরাও তো এটা পালন করে। কই, তাদের ওখানে তো বিশৃঙ্খলা ঘটে না।’ নগরের এই অভিভাবকের সঙ্গেই সুর মিলিয়ে বললেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) এক বড় কর্তা। তাঁর মতে, কোনো উৎসব উদযাপন করতে গিয়ে নগরে যাতে কোনো বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর। তাই তো প্রতিবছর ৩১ ডিসেম্বর রাতে নগরজুড়ে নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বে থাকেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ১২ থেকে ১৫ হাজার সদস্য।
ডিএমপি সূত্রে জানা যায়, ২০০৫ সালের থার্টি ফার্স্ট নাইটে রাত আটটা থেকেই যান চলাচলে কড়াকড়ি আরোপ করেছিল তারা। একইভাবে ২০০৮ সালের থার্টি ফার্স্ট নাইটে পুরো নগরকে আটটি জোনে ভাগ করে তারা নিরাপত্তাচৌকি বসিয়ে তল্লাশির কাজটি সেরেছিল। সব ধরনের নাশকতার আশঙ্কা এড়াতে এ বছরও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ বিশেষ কিছু পরিকল্পনা নেবে বলে জানালেন ডিএমপির জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার মাসুদুর রহমান।
তবে ঘরে-বাইরে যত কড়াকড়িই থাকুক না কেন, তরুণ প্রজন্মের কিন্তু সে বিষয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। তারা আপাতত ভাবছে, কীভাবে কোথায় রাতটি উদযাপন করবে। নেচে-গেয়ে থার্টি ফার্স্ট নাইট উদযাপনের জন্য এরই মধ্যে তরুণেরা উদযাপনের খোঁজখবর নেওয়া শুরু করেছে। পাঁচতারকা হোটেল র‌্যাডিসনের টেনিস কোর্টে জমে উঠবে মালয়েশিয়ান ব্যান্ড হাইপারড্রাইভ ও মরক্কোর এলিনার ব্যালে ড্যান্স। সেই সঙ্গে আমাদের দেশের ডিজে প্রিন্স, ডিজে জুবায়ের, ডিজে মারিয়াও থাকছেন রাতটি মাতাতে, জানালেন ডিজে জুবায়ের। উৎসবের এই আমেজে কোনো কোনো পারফর্মাররা আবার একই রাতে দু-তিন জায়গায়ও উদযাপন করছেন থার্টি ফার্স্ট নাইট। জনপ্রিয় ডিজে রাহাত জানালেন, রাত ১০টা থেকে রাত তিনটা পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে নাচতে পারা যাবে উত্তরা ক্লাবে। রাত তিনটা থেকে তিনি নাচাবেন শেরাটন হোটেলের দর্শকদের। সোনারগাঁও হোটেল অবশ্য তাদের ব্যালকনিতে লাইভ মিউজিকের ব্যবস্থা করেছে। এ ছাড়া নববর্ষের আয়োজন হিসেবে তাদের এখানে থাকছে স্পেশাল লাঞ্চ ও ডিনার। এ ছাড়া সোনারগাঁও হোটেলের বলরুমে থাকছে বিরাট আয়োজন। জানালেন প্যান পাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলের জনসংযোগ বিভাগের সাবরিনা খান।
নগরের অভিজাত ক্লাব আর পার্টি হাউসগুলোর চেয়ে কোনো অংশে কম যায় না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। তাই তো প্রতিবছর থার্টি ফার্স্ট নাইটে রাত ১২টা বাজার সঙ্গে সঙ্গেই আতশবাজি আর শিক্ষার্থীদের কোলাহলে মুখরিত হয়ে ওঠে গোটা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। আনন্দের বাঁধভাঙা জোয়ারে নেচে-গেয়ে দৃপ্ত শপথে নতুন বছরকে স্বাগত জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর কে এম সাইফুল ইসলাম জানান, প্রতিবছরের মতো এবারও বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হবে। ক্যাম্পাসে যাতে বহিরাগত লোকজন অনায়াসে ঢুকতে না পারে, সে জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশদ্বারে প্রবেশপত্র দেখিয়ে ভেতরে আসতে হবে।

No comments:

Post a Comment